NOTICE:- ------------------ ----------------- ---------------------------
Showing posts with label বায়াত. Show all posts
Showing posts with label বায়াত. Show all posts

পীরের আবশ্যকতাঃ-

আহলে বায়াত's photo.
==> দীদারে এলাহী
দেহের রিপুসমূহ ও শয়তান সর্বদাই চায় মানুষকে
কুপথে, কুকর্মে নিতে ও জড়িয়ে রাখতে, যাতে মানুষ
আল্লাহ ও নবী করিম (সাঃ)’র আনুগত্য ত্যাগ
করে চলে । রিপুর (নফসের)সঙ্গে জেহাদকে নবি
করিম (সাঃ) বলেছেনঃ-“জেহাদে আকবর” ।
অর্থাৎ বড় যুদ্ধ । তরীকতের আরিফিনদের (পীরে
কামেলদের) সাহায্য ছাড়া এযুদ্ধে সাফল্য লাভ ও
কলবকে সজীব করার উপায় নাই ।
হযরত বড়পীর শেখ আব্দুর কাদের জিলানী (রহঃ)
“ছবরুল আছবারে” লিখেছেনঃ- “কলব জিন্দা
করবার জন্য যাবতীয় কুরিপু হতে দেলকে
(অন্তরকে) পবিত্র করার জন্য মারেফতপন্থী
পীরে কামেলের অন্বেষণ করা প্রত্যেক নর-নারীর
উপর ফরজ”।
পীরের সাহায্য সহায়তা ব্যাতীত কলবকে
প্রানবন্ত করে তোলা ও রিপুসমূহকে নিজ
আয়ত্তাধীনে আনা সুঃসাধ্য ব্যাপার । নিজের একা
চেষ্টায় তরীকতের পথে আত্মউন্নতির কোন
সম্ভাবনা নাই বলেই পীরের একান্ত প্রয়োজন ।
কামেল পীরের আশ্রয় রিপুসমূহকে আয়ত্তাধীন
দাসবৎ করে রাখতে ও কলবকে কলুষমুক্ত করে
আল্লাহ প্রাপ্তিতে অনন্যসাধারণ সাহায্য প্রদান
করে । তাছাওফের কিতাব পাঠে জ্ঞান লাভ করা
যায় বটে, কিন্তু কিছুই হাসেল করা যায় না ।
কাজেই আধ্যাত্মিক জ্ঞান (মারেফত) হাসেলের
জন্য “ওছিলার” দরকার । পীর “ওছিলা” বটে ।
তফছিরে রুহুল বয়ানে উল্লেখ আছেঃ-“পীরে কামেল
আল্লাহ পাওয়ার ওছিলা ।” বিখ্যাত ‘ছেরাতে
মুস্তাকিম’ নামক কেতাবে লিপিবদ্ধ আছেঃ-“খোদা
প্রাপ্তির ‘ওছিলা’ হচ্ছে মুর্শীদ বা পীর ।
পীরেরদেওয়া দীক্ষাই সৌঅই পীরের শরণাপন্ন হতে
হয় এবং এতে ক্রমান্বয়ে অন্তরে আল্লাহর প্রতি
মহব্বত সৃষ্টি হয় । এমহব্বতই (ঐশীপ্রেমই)
আল্লাহর পরিচয় ঘটায় ও আল্লাহর সান্নিধ্য
বাস্তবায়িত করে । পীরে কামেল আল্লাহর
ছায়াস্বরূপ ।
মৌলানা রুমী (রহঃ) বলেছেনঃ-“পীরে কামেল যখন
আল্লাহর ছায়া মাত্র এবং আল্লাহর নৈকট্য
লাভের প্রধান উপায় (ওছিলা), তখন তাদের
ওছিলার জাতে পাকের (আল্লাহর) মহব্বত হাসেল
কর ।”
পীর মুরীদের পশুবৃত্তিকে দমিয়ে আত্মায় ঐশীভাব
জাগিয়র তোলে মুরীদকে আল্লাহর রাস্তায় আনয়ন
করে । কোরানে পীর প্রয়োজনীয়তার উল্লেখ
হয়েছে । আল্লাহর নৈকট্য লাভ ও মুক্তির
উদ্দ্যেশ্যই পশুবৃত্তির ও কলুষরুপ ব্যাধি হতে
আত্মাকে সুস্থ রাখার জন্য পীর খুঁজে নিতে বলা
হয়েছে । এখানে উল্লেখ্য যে, শিক্ষাজনিত
আত্মগৌরব বিস্মৃত হয়ে পীরের সমীপে আসতে
হবে, যাতে মনের গর্বভাব না থাকে । কামেল
পীরের সাহায্য ব্যাতীত অন্তরকে সুস্থ রাখা
যেকোন মানুষের পক্ষেই খুব কঠিন ব্যাপার ।
মওলানা রুমী (রহঃ) বলেছেনঃ-“অন্তরের রোগের
প্রতিকারের জন্য প্রত্যেকের উচিত কামেল
পীরের অন্বেষণ করা । কামেল ব্যাতীত কেউ
অন্তরকে সুস্থ রাখতে পারে না ।”

যারা মারা গেল অথচ বায়াত হলোনা সে যেন জাহিলদের মতো মারা গেল।

ইমামুল হক's photo.
"তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহ পাক উনার ও উনার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উনার, আর যদি তোমরা তা থেকে বিমূখ হও তাহলে জেনে রেখ আল্লাহ পাক তিনি কাফিরদের ভালোবেসেন না। "(সূরা -আল ইমরান : আয়াত শরীফ ৩২)
.
আর হাদীস শরিফে আছে [মান লাম ইয়া'রিফ ইমামা জামানিহী ফাক্বাদ মাতা মিতাতাল জাহেলিয়্যা]
অর্থঃ যে ব্যাক্তি তাঁর জামানার ইমাম বা মোজাদ্দেদকে চিনতে পারেনি আর এ অবস্থায় সে মৃত্যু বরণ করলো, তবে তার মৃত্যু জাহেলদের মতো হলো। (আবু দাউদ শরীফ ও মেশকাত শরীফ)।
.
পবিত্র হাদিস শরিফের অন্য বর্ননায় উল্লেখ আছে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনি বলেন "যারা মারা গেল অথচ বায়াত হলোনা সে যেন জাহিলদের মতো মারা গেল। (মুসলীম শরিফ ও মেসকাত শরীফ ৭ম খন্ড, ২৩৪, পৃঃ)
.

তাসাউফ অর্জন ও বাইয়া’ত গ্রহণ




আলহাজ্ব মুফতী গাজী সাইয়্যেদ মুহাম্মদ সাকীউল কাউছার (মা:)
(ডাবল টাইটেল ফার্স্ট ক্লাস-বিএ)
নায়েব-ই সাজ্জাদানশীন, ঘিলাতলা দরবার শরীফ, কুমিল্লা।

 
ইসলামে তাসাউফ তথা শরীয়তের পাশাপাশি তরীকত হাকীকত ও মারেফাত অর্জন এবং সে জন্য পীর-মুর্শিদের কাছে বাইয়া’ত গ্রহণ একটি অত্যাবশকীয় বিষয় যা কোরআন হাদীছ ইজমা ও ক্বিয়াস দ্বারা সাব্যস্ত।


এ প্রসঙ্গে প্রথমে আমি মহান কোরআনুল কারীমের আয়াত শরীফ উল্লেখ করছি। আল্লাহ পাক বলেন - 


لقد من الله على المؤمنين اذ بعث فيهم رسولا من انفسهم يتلوا عليهم أيته يزكيهم و يعلمهم الكتب والحكمة و ان كانوا من قبل لفى ضلل مبين-
 

(লাকাদ মান্নাল্লাহু আলাল মু’মিনীনা ইঁজ বা'আছা ফীহিম রাছুলাম মিন আনফুছিহিম ইয়াতলু আলাইহিম আ-ইয়াতিহী ওয়া ইয়ূজাক্কিহিম ওয়া ইয়ূ আল্লীমুহুমুল কিতাবা ওয়াল হিকমাহ ওয়া ইন কানু মিন কাবলু লাফী দ্বালা-লিম মুবীন)।

অর্থাৎ, মু’মিনদের প্রতি আল্লাহ পাকের বড়ই ইহসান যে তাদের মধ্যে হতে তাদের জন্য একজন রসূল প্রেরণ করেছেন, তিনি আল্লাহ পাকের আয়াতগুলো তেলায়াত করে শুনাবেন, তাদেরকে তাজকিয়া (পরিশুদ্ধ) করবেন এবং কিতাব ও হিকমত (আধ্যাত্মিক) জ্ঞান শিক্ষা দিবেন। যদিও তারা পূর্বে হেদায়েত প্রাপ্ত ছিল না। (সূরা আল এমরান, আয়াত-১৬৪)


অনুরূপভাবে, সুরা বাকারা’র ১২৯ ও ১৫১ নং আয়াত শরীফে উপরোক্ত আয়াত শরীফের সমার্থবোধক আয়াতে কারীমার উল্লেখ আছে। মূলতঃ উল্লেখিত আয়াত শরীফে বিশেষভাবে চারটি বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে: তন্মধ্যে আয়াত শরীফ তেলাওয়াত করে শুনানো এবং কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেয়া, এ তিনটি বিষয় হচ্ছে এলমে জাহির বা ইলমে ফিকাহ এবং ইলমে মারেফতের অন্তর্ভুক্ত। যা এবাদাতে জাহের বা দ্বীনের যাবতীয় বাহ্যিক হুকুম আহকাম পালন করার জন্য ও দৈনন্দিন জীবন যাপনে হালাল কামাই করার জন্য প্রয়োজন। আর চতুর্থ হচ্ছে তাজকিয়ায়ে "ক্বলব", অর্থাৎ, অন্তর পরিশুদ্ধ করার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি লাভ করা। মুফাসসিরীনে কিরামগণ "ইউযাক্কীহিম"-এর ব্যাখ্যায় প্রসিদ্ধ তাফসীরের কিতাব, যেমন তাফসীরে জালালাইন-কামালাইন, বায়হাকী, ইবনে কাছীর, রুহুল বয়ান, তাফসীরে মাযহারী, মা’রেফুল কোরআন-সহ আরও অনেক তাফসীরে তাজকিয়ায়ে ক্বলব বা অন্তঃকরণ পরিশুদ্ধ করাকে ফরজ বলেছেন এবং তজ্জন্যে এলমে তাসাউফ অর্জন করাও ফরজ বলেছেন। এ প্রসঙ্গে বিখ্যাত মুফাসসিরে ফকিহুল উম্মত হযরত মাওলানা শায়খ ছানাউল্লাহ পানি পথি (রহ:) তাঁর বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ ‘তাফসীরে মাযহারী’-তে উল্লেখ করেন, যে সকল লোক ইলমে লা-দুন্নী বা ইলমে তাছাউফ হাছিল করেন তাঁদেরকে সূফি বলে। তিনি ইলমে তাছাউফ অর্জন করা ফরজ আইন বলেছেন। কেননা, ইলমে তাছাউফ মনকে বা অন্তঃকরণকে গায়রুল্লাহ হতে ফিরিয়ে আল্লাহ পাকের দিকে রুজু করে দেয়। সর্বদা আল্লাহ পাকের হুজুরী পয়দা করে দেয় এবং ক্বলব্ বা মন থেকে বদ খাছলত-সমূহ দূর করে নেক খাছলত-সমূহ পয়দা করে অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে দেয়।


আত্মশুদ্ধি অর্জনের জন্য ইলমে তাসাউফ যে ফরজ, এ প্রসঙ্গে আফজালুল মুফাসসিরীন আল্লামা হযরত ইসমাঈল হাক্কি (রহ:) তাঁর ‘তাফসীরে রুহুল বয়ানে’ উল্লেখ করেন যে, দ্বিতীয় প্রকার ইলম হচ্ছে ইলমে তাছাউফ যা ক্বলব বা অন্তরের সাথে সংশ্লিষ্ট। এ ইলম অর্জন করা প্রত্যেক মু’মিনের জন্য ফরজ।


এলমে তাছাউফ অর্জন করা ফরজ হওয়া সম্পর্কে ‘জামিউল উসুল’ নামক কিতাবে উল্লেখ আছে যে, এলমে তাছাউফ বদ খাছলত-সমূহ হতে নাজাত বা মুক্তি পাওয়ার একমাত্র মাধ্যম। পক্ষান্তরে, আল্লাহ-প্রাপ্তি, রিপু বিনাশ ও সংযম শিক্ষার একমাত্র পথও। এই জন্য ইলমে তাছাউফ শিক্ষা করা ফরজে আইন।


মূলতঃ শরীয়ত, তরীকত, হাকীকত ও মারেফত, এ সবের প্রত্যেকটি-ই কোরআন সুন্নাহসম্মত এবং তা মানা ও বিশ্বাস করে কার্যে পরিণত করা কোরআন-সুন্নাহ’র-ই নির্দেশের অর্ন্তভুক্ত।


আল্লাহপাক তাঁর কালাম পাকে এরশাদ করেন -


لكل جعلنا منكم شرعة و منهاجا “লি-কুল্লিন-জ্বায়াল না মিনকুম শির’আতাউ ওয়া মিনহাজ”।


অর্থাৎ, আমি তোমাদের প্রত্যেকের জন্য একটি জীবন বিধান বা শরীয়ত, অপরটি তরীকত-সম্পর্কিত বিশেষ পথ নির্ধারণ করে দিয়েছি। (সূরা মাইয়িদা, আয়াত ৪৮)


আল্লাহ পাক তাঁর কালাম পাকে আরও এরশাদ করেন -

و ان لواستقاموا على الطريقة- (ওয়া আল লাওয়িস্তেকামু আলাত তারীকাতে- সূরা জ্বিন আয়াত ১৬)


অর্থাৎ, তারা যদি তরীকতে (সঠিক পথে) কায়েম থাকতো। অতএব, তরীকত শব্দটি কোরআন শরীফে রয়েছে।


আর হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে -


الشَّريةٌ شَجرَةٌ وَ الطَّرِيقَةُ اَغصَانُهَا وَ المَعرِفَةُ اَورَقُهَا وَ الحَقِيقَةُ ثَمَرُهَا
-
 

অর্থাৎ, শরীয়ত একটি বৃক্ষস্বরূপ, তরীকত তার শাখা প্রশাখা, মারেফাত তার পাতা এবং হাকীকত তার ফল । (সিসরুল আসরার)

হাদীস শরীফে আরও এরশাদ হয়েছে - 


اَلشَّرِيعَةُ اَقوَالِى وَ الطَّرِقَةُ اَفعَالِى وَالحَقِيقَةُ اَحوَالِى وَالمَعرِيفَةُ اَسرَارِى-
 

অর্থাৎ, শরীয়ত হলো আমার কথাসমূহ (আদেশ-নিষেধ), তরীকত হলো আমার কাজসমূহ (আমল), হাকীকত হলো আমার গুপ্ত রহস্য। (ফেরদাউস)

উল্লেখ্য যে, উক্ত শিক্ষা বা এলমে তাছাউফ অর্জন করার ও এছলাহে নাফস বা আত্মশুদ্ধি লাভ করার একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে এমন কোনো কামেলে-মোকাম্মেল পীর-মুর্শিদের কাছে বাইয়া’ত হওয়া, যিনি ফয়েজ দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। এখন প্রশ্ন হলো, এছলাহে নাফস বা আত্মশুদ্ধি লাভ করা যদি ফরজ হয়, আর তা লাভ করার মাধ্যম বাইয়া’ত হয়, তবে বাইয়া’ত হওয়া নাজায়েজ হয় কী করে?


তরীকত যথাযথভাবে পালন করতে হলে দ্বীনী এলেম অর্জন করতে হবে যা ফরজ। এই এলেম দু'প্রকার- ১) ইলমে ফিকাহ, ২) ইলমে তাছাউফ।


ইলমে ফিকাহ: ইলমে ফিকাহ দ্বারা এবাদাতে জাহেরা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ হয়। ইলমে তাছাউফ-এর দ্বারা এবাদাতে বাতেন বা অভ্যন্তরীন অবস্থা পরিশুদ্ধ হয়ে ইখলাছ অর্জিত হয়। এ মর্মে হাদীছ শরীফে এরশাদ হয়েছে - 


عن الحسن رضى الله عنه قال العلم علمان فعلم فى القلب فذاك العلم النافع و علم على للسان فذالك حجة الله غز و جل على ابن ادم-
 

(আনিল হাসান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ক্বালা আল এলমু এলমানে ইলমু ফিল ক্বালবে ফাজাকাল ইলমুন নাফেউ ওয়া ইলমুল আলাল লেছানি ফাজাকা হুজ্জাতুল্লাহে আলা এবনে আদামা)। অর্থাৎ, এলেম দু'প্রকার (১) ক্বালবী এলেম। এটা হলো উপকারী এলেম। (২) লিসানী বা জবানী এলেম। এটা হলো আল্লাহ পাকের পক্ষ হতে আদম সন্তানদের প্রতি দলীলস্বরূপ। (মিশকাত শরীফ)

আর এ হাদীসের ব্যাখ্যায় মালিকী মজহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম, ইমামুল আইম্মা রঈসুল মুহাদ্দিসীন ফখরুল ফুকাহা শায়খুল উলামা হযরত ইমাম মালিক (রহঃ) বলেন -


مَن تَفَقَّهَ وَ لَم يَتَصَوَّفَ فَقَد تَفَسَّقَ وَ مَن تَصَوَّفَ وَ لَم يَتَفَقَّهَ فَقَد تَزَندَقَ وَ مَن جَمَعَ بَينَهُمَا فَقَد تَحضقَّقَ-
 

অর্থাৎ, যে ব্যক্তি এলেম ফিকাহ (জবানী এলেম) অর্জন করলো, কিন্তু এলেম তাছাউফ (ক্বালবী) এলেম অর্জন করলো না, সে ব্যক্তি ফাসিক। আর যে ব্যক্তি ইলমে তাছাউফের দাবি করে, কিন্তু শরীয়ত স্বীকার করেনা, সে ব্যক্তি যিন্দীক (কাফের); আর যে ব্যক্তি উভয় প্রকার এলেম অর্জন করলো সে ব্যক্তি মুহাক্কিক তথা মু’মিনে কামেল। (মিরকাত, কিতাবুল ইলম)

অর্থাৎ, এলমে ফিকাহ ও এলমে তাছাউফ উভয় প্রকার এলেম অর্জন করে দ্বীনের ওপর সঠিকভাবে চলার চেষ্টা করা প্রত্যেকের জন্য ফরজ। বর্তমান মুসলমানের কাছে আসল সত্য জিনিস বা শিক্ষা না থাকাতে মানুষ প্রকৃত মু’মিন হতে পারছে না। কেবল মাত্র ক্বলব নামের অমূল্য রত্নটা হস্তগত করতে জীবনের সব সময়ই চলে যায়, তবে মানুষ খাঁটি ঈমানদার হবে কবে। এ জন্য আমরা চিন্তা ফিকির করি না। তরীকতের এমন সরল সহজ পথ অবলম্বন করা দরকার যাতে খুবই অল্প সময়ের মধ্যে উক্ত নেয়ামত পেতে সক্ষম হয়। উল্লেখ্য যে, উক্ত নেয়ামত বা এলমে তাছাউফ অর্জন করার ও এছলাহে নফস বা আত্মশুদ্ধি লাভ করার একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে কোনো কামেলে-মোকাম্মেল পীর-মুর্শিদের কাছে বাইয়া’ত হওয়া। এখন প্রশ্ন হলো তাজকিয়ায়ে নাফস বা আত্মশুদ্ধি লাভ করা যদি ফরজ হয়, আর তা লাভ করার মাধ্যম বাইয়া’ত হয়, তবে বাইয়া’ত হওয়া নাজায়েজ হয় কী করে? কেননা উছুল-ই রয়েছে যে আমলের দ্বারা ফরজ পূর্ণ হয় এবং সেই ফরজকে পূর্ণ করার জন্য সে আমল করাও ফরজ। উদাহরণ দিলে বুঝতে পারবেন: যেমন এ প্রসঙ্গে "দুররুল মুখতার" কিতাবে উল্লেখ আছে, যে আমল ব্যতিরেকে ফরজ পূর্ণ হয় না বা আদায় হয় না, সে ফরজ আদায় করার জন্য সে আমলটাও ফরজ। যেমন উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, নামাজ আদায় করা ফরজ। আর এ নামাজ আদায় হওয়ার একটি শর্ত হচ্ছে পবিত্রতা অর্জন করা, অর্থাৎ, ওজু। যখন কেউ নামাজ আদায় করবে, তখনই তার জন্য ওযু করা ফরজ হয়ে যাবে। যেহেতু ওজু ছাড়া নামাজ হবে না, ঠিক তদ্রুপ-ই এলমে তাছাউফ অর্জন করা ফরজ। আর বাইয়া’ত হওয়াও ফরজ। আর হাদীস শরীফের ভাষায় এ ধরণের ফরজকে অতিরিক্ত ফরজ বলে গণ্য করা হয়েছে। কাজেই উক্ত হাদিসে বর্ণিত অতিরিক্ত ফরজের অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে মাজহাব মানা, বাইয়া’ত হওয়া ইত্যাদি।


বস্তুতঃ পীর-মুর্শিদের কাছে বাইয়া’ত হতে হবে। এটা মহান আল্লাহ পাকের কালামে অসংখ্য আয়াত দ্বারাই প্রমাণিত। যদি এখন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মহাজ্ঞানী ব্যক্তিবর্গগণ নিজেদের স্বার্থ অক্ষুন্ন রাখার জন্য না মানেন, তবে কার কী বলার আছে। তাদেরকে যতোই বোঝানো হউক না কেন, কিছুতেই তারা বোঝার চেষ্টা করবে না; বা বুঝতে সক্ষম হয় না। তাদের ক্বালবে সীলমোহর মারা আছে।


সূফীকুল শিরোমনি আল্লামা জালাল উদ্দিন রুমী (রহ:) বলেন -


‘ইলমে জাহের হাম চুঁ মসকা, ইলমে বাতেন হাম চুঁ শীর
কায় বুয়াদে বে শীরে মসকা, কায় বুয়াদে বেপীরে পীর’।


অর্থাৎ, ইলমে জাহের জানো দুধের মেছাল (উপমা), আর বাতেন জানো মাখনের মেছাল, দুধ ছাড়া মাখন কীভাবে হয় আর পীরের আনুগত্য ছাড়া পীর কীভাবে হয়। (মসনবী শরীফ)


এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ পাক তাঁর পবিত্র কালামে এরশাদ করেন -


ﻳَﺎ ﺃَﻳُّﻬَﺎ ﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﺁَﻣَﻨُﻮﺍ ﺍﺗَّﻘُﻮﺍ ﺍﻟﻠَّﻪَ ﻭَﻛُﻮﻧُﻮﺍ ﻣَﻊَ ﺍﻟﺼَّﺎﺩِﻗِﻴﻦَ
 

(ইয়া আইয়্যুহাল্লাজীনা আ-মানুত্তাক্কুলা ওয়া কুনু মা’আছ্ছাদিকীন)।

অর্থাৎ, "হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ পাককে ভয় করো, আর ছাদেকীনদের সঙ্গী হও" (সূরা তওবা, আয়াত-১১৯)। এ আয়াত পাকে আল্লাহ পাক মূলতঃ পীর-মাশায়েখগণের সঙ্গী বা সোহবত এখতিয়ার করার কথা বলেছেন। কারণ হক্কানী মুর্শিদগণ-ই হাকীকি ছাদেকীন।


আল্লাহ্‌ সুবহানাহু তা’আলা কোরআন শরীফের প্রথম সূরাতেই শিখিয়ে দিচ্ছেন -


ﺍﻫْﺪِﻧَﺎ ﺍﻟﺼِّﺮَﺍﻁَ ﺍﻟْﻤُﺴْﺘَﻘِﻴﻢَ ﺻِﺮَﺍﻁَ ﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﺃَﻧْﻌَﻤْﺖَ ﻋَﻠَﻴْﻬِﻢْ
 

অর্থাৎ, আমাদের সরল সঠিক পথ [সীরাতে মুস্তাকিম] দেখাও। তাঁদের পথ যাঁদেরকে তুমি নিয়া’মত দান করেছো। {সূরা ফাতিহা, ৬-৭}

সূরায়ে ফাতিহায় মহান রাব্বুল আলামীন তাঁর নিয়ামতপ্রাপ্ত বান্দারা যে পথে চলেছেন, সেটাকে সাব্যস্ত করেছেন সীরাতে মুস্তাকিম।


আর তাঁর নিয়ামতপ্রাপ্ত বান্দারা হলেন -


ﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﺃَﻧْﻌَﻢَ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻬِﻢْ ﻣِﻦَ ﺍﻟﻨَّﺒِﻴِّﻴﻦَ ﻭَﺍﻟﺼِّﺪِّﻳﻘِﻴﻦَ ﻭَﺍﻟﺸُّﻬَﺪَﺍﺀِ ﻭَﺍﻟﺼَّﺎﻟِﺤِﻴﻦَ
 

অর্থাৎ, যাদের ওপর আল্লাহ তা’আলা নিয়ামত দিয়েছেন, তাঁরা হলেন নবীগণ, সিদ্দীকগণ, শহীদগণ ও নেককার বান্দাগণ। {সূরা নিসা, ৬৯}

এ দু’আয়াত একথাই প্রমাণ করছে যে, নিয়ামতপ্রাপ্ত বান্দা হলেন নবীগণ, সিদ্দীকগণ, শহীদগণ, আর নেককারগণ তথা আল্লাহ’র অলীগণ।যাঁদের শানে আল্লাহ্‌ নিজেই ঘোষণা দেন -


ألاَ اِنَّ اَولِياَء اللهِ لاَ خَوفٌ عَلَيهِم وَلَاهُم يَحزَنُون-
 

অর্থাৎ, সাবধান! নিশ্চয়ই আল্লাহ’র অলী বা বন্ধুগণের কোনো ভয় নেই এবং তাঁদের কোনো চিন্তা-পেরেশানী নেই। (সূরা ইউনূস, ৬২)

আর ওই সকল প্রিয় বান্দাদের পথ-ই সরল সঠিক তথা সীরাতে মুস্তাকিম। অর্থাৎ, তাঁদের অনুসরণ করলেই সীরাতে মুস্তাকিমের ওপর চলা হয়ে যাবে। যেহেতু আমরা নবী দেখিনি, দেখিনি সিদ্দীকগণও, দেখিনি শহীদদের। তাই আমাদের সাধারণ মানুষদের কুরআন সুন্নাহ থেকে বের করে সীরাতে মুস্তাকিমের ওপর চলার চেয়ে একজন পূর্ণ শরীয়ত-তরীকতপন্থী হক্কানী বুযুর্গের অনুসরণ করার দ্বারা সীরাতে মুস্তাকিমের ওপর চলাটা হবে সবচেয়ে সহজ। আর একজন শরীয়ত সম্পর্কে প্রাজ্ঞ আল্লাহ ওয়ালা ব্যক্তির সাহচর্য গ্রহণ করার নাম-ই হল পীর-মুরিদী বা তাসাউফ অর্জন ও বাইয়া’ত গ্রহণ।


আল্লাহ পাক তাঁর পাক কালামে আরো এরশাদ করেন —


يا ايها الذين امنوا وابتغوا اليه الوسيلةَ وَ جَاهِدُوا فِى سَبِيلِهَ لَعَلَّكُم تُفلِحُون-
 

(ইয়া আইয়্যূলহাল্লাজীনা আ-মানুত্তা কুল্লাহা অবতাগু ইলাইহিল অছিলাতা অ জ্বা-হিদু ফি ছাবিলিহী লা’আল্লাকুম তুফলিহুন)। অর্থাৎ, "হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহপাককে ভয় করো, আর তাঁর সন্তষ্টি লাভের জন্য উছিলা গ্রহণ করো (সুরা মায়িদা, আয়াত-৩৫)।

মুফাসসিরীনগণ বলেন, উল্লেখিত আয়াত শরীফে বর্ণিত উছিলা দ্বারা তরীকতের মাশায়েখগণকে বোঝানো হয়েছে। যেমন তাফসীরে রুহুল বয়ানে উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে -‘আল ওয়াসলু লা ইয়াহছিলু ইল্লা বিল উছিলাতে ওয়াহিয়া ওলামায়ে মুহাক্কেকীনা ওয়া মাশায়েখুত তরিকত’, অর্থাৎ, উক্ত আয়াতে উছিলা ছাড়া উদ্দেশ্যকে (আল্লাহ্‌কে) লাভ করা যাবেনা, আর সে উছিলা হলো মুহাক্কীক আলেম বা যিনি তরীকতের শায়খ বা পীর। যদিও অনেকে নামাজ, রোজা, হজ্ব, যাকাত, দান সদকা, জিহাদ ইত্যাদিকে উছিলা বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু হাকিকতে পীর-মাশায়েখগণই হচ্ছেন প্রধান ও শ্রেষ্ঠতম উছিলা। কারণ পীর-মাশায়েখগণের কাছে বাইয়া’ত হওয়া ছাড়া তাজকিয়া নাফস বা আত্মশুদ্ধি অর্জিত হয় না। আর আত্মশুদ্ধি ব্যতিরেকে নামাজ, রোজা, হজ্জ, যাকাত, জিহাদ, তাবলীগ কোনো কিছুই আল্লাহ পাকের দরবারে কবুল হয় না বা নাজাতের উছিলা হয় না। তাই দেখা যাবে অনেক লোক নামাজ, রোজা, হজ্ব, যাকাত, দান ছদকা, জিহাদ, তাবলীগ ইত্যাদি করেও এক লাফে জাহান্নামে যাবে। যেমন আল্লাহ পাক বলেন,فويل للمصلين (ফাওয়াইলুল্লিলমুছাল্লিন); অর্থাৎ, মুসুল্লীদের জন্য জাহান্নাম (সূরা মাউন, আয়াত-৭)। কোন মুসুল্লী জাহান্নামে যাবে - যে মুছল্লী তাজকিয়ায়ে নাফসের মাধ্যমে অন্তর থেকে রিয়া দূর করে "ইখলাছ" হাছেল করেনি, তাই সে মানুষকে দেখানোর জন্য নামাজ আদায় করছে। আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টির জন্য নামাজ আদায় করেনি। আল্লাহ বলেন, "আল্লাজিনা হুম ইউরা-উন"। অর্থাৎ, তারা ওই নামাজি যারা রিয়ার সহকারে নামাজ আদায় করেছে (সূরা-মাউন, আয়াত-৬)।
একটি হাদীছ শরীফ উল্লেখ করলাম যাতে আপনারা বুঝতে পারেন। মুসলিম শরীফের ছহীহ হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে যে কেয়ামতের দিন শহীদ, দানশীল ও দ্বীন প্রচারকারী আলেম, এ তিন প্রকার লোক থেকে কিছু লোককে সর্বপ্রথম জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে, যেহেতু তারা এখলাছের সাথে জিহাদ, তাবলীগ, দান ছদকা ইত্যাদি করেনি। যে সব আলেম বলে থাকে কোরআন শরীফে বর্ণিত উছিলা হচ্ছে নামাজ, রোজা, হজ্ব, যাকাত, জিহাদ ইত্যাদি, তাদের কাছে আমার প্রশ্ন: তাহলে নামাজ আদায় করে জিহাদ করে ইলিয়াছি তাবলীগ করেও বান্দা জাহান্নামে যাবে কেন? কেনো উক্ত আমলসমূহ তার জন্য নাজাতের উছিলা হলো না? নিশ্চয়ই আপনারা বলবেন, তাদের এখলাছ ছিল না। কেন এখলাছ ছিল না? তারা কামেলে-মোকাম্মেল পীরের কাছে বাইয়া’ত হয়ে এলমে তাছাউফ আমলের মাধ্যমে তাজকিয়ায়ে নফস বা আত্মশুদ্ধি লাভ করে এখলাছ অর্জন করেনি। তাহলে বোঝা গেল, পীর-মাশায়খগণ হচ্ছেন প্রধান ও শ্রেষ্ঠতম উছিলা, তথা উছিলাসমূহের উছিলা। কারণ তাঁদের কাছে বাইয়া’ত হওয়ার উছিলাতেই এছলাহ লাভ হয়, এখলাছ অর্জিত হয়। যার ফলে নামাজ, রোজা, জিহাদ, দান খয়রাত ইত্যাদি কবুল হয় বা নাজাতের উছিলা হয়।


কামেল পীর-মুর্শিদের গুরুত্ব সম্পর্কে আল্লাহ পাক এরশাদ করেন -


من يهد الله فهو المهتد و منيضلل فلن تجد له وليا مرشدا-
 

(মাই ইয়াহদিল্লাহু ফাহুয়াল মুহতাদে ওয়ামাই ইয়ুদ্বলিল ফালান তাজিদালাহু ওলিইয়্যাম মুর্শেদা)

অর্থাৎ, যে ব্যক্তি হেদায়েত চায় আল্লাহ পাক তাকে হেদায়ত দেন, আর যে ব্যক্তি গোমরাহীর মধ্যে দৃঢ় থাকে সে কখনও অলিয়ে কামেল মুর্শিদ খুঁজে পাবে না (সূরা-কাহাফ, আয়াত-১৭)। উক্ত আয়াত শরীফের দ্বারা মূলতঃ এটাই বোঝানো হয়েছে যে ব্যক্তি কোনো কামেল-মোকাম্মেল পীর সাহেবের কাছে বাইয়া’ত হয়নি, সে ব্যক্তি গোমরাহ।


আল্লাহ্‌ পাক আরও মুর্শিদের আনুগত্যের বিষয়ে এরশাদ করেন -


أَطِيعُوا الله وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِى الآَمرِ مِنكُم-
 

অর্থাৎ, আনুগত্য করো আল্লাহ’র, আনুগত্য করো রাসূলের এবং যারা তোমাদের মধ্যে হুকুমদাতা। (সূরা নিসা, আয়াত নং ৫৯)

উক্ত আয়াতে কারীমায় ‘ তোমাদের মধ্যে যারা হুকুমদাতা (উলিল আমর)’ দ্বারা শরীয়ত ও তরীকতের আলেমকে বোঝানো হয়েছে। এটাই বিশুদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য মত।


আল্লাহ পাক ঘোষণা করেন- يوم ندعوا كل اناس بامامهم অর্থাৎ, সেই দিন আমি প্রত্যেক দলকে তাদের ইমামের (শায়খের) নামে আহ্বান করবো। (সূরা বনি ইসরাঈল)


এই আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসীরে “আ’রায়েসুল বয়ান”-এ উল্লেখ রয়েছে, “ওয়া ইয়াদ’উল মুরীদিনা বে আসমায়ে মাশায়েখেহীম”। অর্থাৎ, হাশরের দিন প্রত্যেক মুরীদকে ডাকা হবে যার যার শায়খ বা পীরের নামে। তাই পীরের দলভুক্ত হয়ে আল্লাহ’র দরবারে হাজিরা দিতে হবে।


 বাইয়াত

 
“বাইয়া’ত” শব্দের উৎপত্তি হয়েছে, “বাইয়ু’ন” শব্দ থেকে।“বাইয়ু’ন” শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে “ক্রয়-বিক্রয়”। এখানে এই “ক্রয়-বিক্রয়” মানে হচ্ছে আমার আমিত্বকে আল্লাহর রাহে রাসূল (দ:) বা নায়েবে রাসূলের কাছে কোরবান করে দিলাম, বিলীন করে দিলাম, বিক্রি করে দিলাম। আমার আমিত্ব, আমার যতো অহংকার আছে, অহমিকা আছে, আমি আমি যতো ভাব আছে, সমস্ত কিছু আল্লাহর রাসূল (দ:) বা নায়েবে রাসূলের কাছে আল্লাহর রাহে সম্পূর্ণরূপে উৎসর্গ করে দেয়া, কোরবান করে দেয়া, বিক্রি করে দেয়া, এবং পক্ষান্তরে, রাসূল (স:)-এর কাছ থেকে কোরআন সুন্নাহ-ভিত্তিক জীবনব্যবস্থা খরিদ করে, সমস্ত উপাসনার মালিক আল্লাহ, এবাদতের মালিক আল্লাহ, কুল মখলুকাতের মালিক আল্লাহ, এই দৃঢ় ঈমানে ঈমানদার হয়ে যাওয়া, এটাকেই বলা হয় বাইয়াত বা “ক্রয়-বিক্রয়”।


আল্লাহ্‌ রাব্বুল ইজ্জত এরশাদ করেন -


آَ نَّ اللهَ اَشتَرَى مِنَ المُؤمِنِينَ اَنفُسَهُم وَ اَموَالَهُم بِاَنَّ لَهُمُ الجَنَّةَ يُقَاتِلُونَ فِى سَبِيلِ اللهِ فَيَقتُلُونَ وَ يُقتَلُونَ وَعدَا عَلَيهِ حَقَّا فِى التَّورة وَالاِنجِيلِ وَالقُرأنِ وَ مَن اَوفى بِعَهدِهِ مِنَ اللهِ فَاستَبشِرُوا بِبَيعِكُمُ الَّذِى بَايَعتُمْ بِهِ وَ ذًالِكَ هُوَ الْفًوْزُ الْعَظِيمُ-
 

অর্থাৎ, নিশ্চয়ই আল্লাহ খরিদ করে নিয়েছেন মু’মিনদের থেকে তাদের জান ও মাল এর বিনিময়ে যে, অবশ্যই তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত। তারা যুদ্ধ করে আল্লাহর পথে, কখনও হত্যা করে এবং কখনও নিহত হয়। তাওরাত ও কুরআনে এ সম্পর্কে সত্য ওয়াদা রয়েছে। আল্লাহর চাইতে নিজের ওয়াদা অধিক পালনকারী আর কে আছে? সুতরাং তোমরা আনন্দ করো তোমাদের সে সওদার জন্য যা তোমরা তাঁর সাথে করেছ। আর তা হলো মহা সাফল্য। (তাওবা:১১১)

لَقَد رَضِىَ الله عَنِ المُؤمِنِينَ اِذ يُبَايِعُونَكَ تَحتَ الشَّجَرَةِ-
 

অর্থাৎ, হে রাসূল! আল্লাহ মু’মিনদের ওপর সন্তুষ্ট হয়েছেন, যখন তারা গাছের নিচে আপনার কাছে বাইয়া’ত হচ্ছিল। (সূরা ফাতহা : ১৮)

* যে ব্যক্তি তার ওয়াদা (প্রতিশ্রুতি) পূর্ণ করবে এবং তাকওয়ার নীতি অবলম্বন করবে, সে আল্লাহ পাকের প্রিয়জন হবে। আর নিশ্চিতভাবে আল্লাহ পাক মুত্তাকীদের ভালোবাসেন। (সূরা আলে ইমরান: ৭৬)


o ﺇِﻥَّ ﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﻳُﺒَﺎﻳِﻌُﻮﻧَﻚَ ﺇِﻧَّﻤَﺎ ﻳُﺒَﺎﻳِﻌُﻮﻥَ ﺍﻟﻠَّﻪَ ﻳَﺪُ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﻓَﻮْﻕَ ﺃَﻳْﺪِﻳﻬِﻢْ
 

অর্থাৎ, হে রাসূল! যেসব লোক আপনার কাছে বাইয়া’ত হচ্ছিল, তারা আসলে আল্লাহর কাছেই বাইয়া’ত হচ্ছিল। তাদের হাতের ওপর আল্লাহর (কুদরতের) হাত ছিল। (সূরা ফাতহা-১০)

يَاايٌهَا النَّبِىٌّ اِذا جَاءَكَ المُؤمِنتِ ﻳُﺒَﺎﻳِﻌْﻧَﻚَ-
 

অর্থাৎ, হে রাসূল (দ:)! যে সকল মু’মিন মহিলারা আপনার কাছে বাইয়াত হওয়ার জন্য আসে (মুরিদ হওয়ার জন্য আসে), তাঁদেরকে আপনি বাইয়া’ত দান করুন। (সূরা মুমতাহানা: ১২)

হাদিছ শরীফে বর্ণিত আছে যে, হযরত আওফ বিন মালেক আশ’আরী (রা:) বলেন, আমরা ৯ জন কিংবা ৮ অথবা ৭ জন নবী করীম (দ:)-এর খেদমতে উপস্থিত ছিলাম। হযরত নবী করীম (দ:) বললেন, তোমরা কি আল্লাহর রাসূলের হাতে বাইয়া’ত হবে না? আমরা নিজ নিজ হাত প্রসারিত করে দিলাম এবং বললাম, হে আল্লাহ’র রাছুল (দ:) কোন বিষয়ের বাইয়া’ত হবো? নবী পাক (দ:) বললেন, এ বিষয়ের ওপর যে তোমরা আল্লাহ পাকের এবাদত করবে, তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবে না, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ কায়েম করবে এবং যাবতীয় হুকুম-আহকাম শুনবে ও মান্য করবে। (মুসলিম, আবু দাউদ ও নাছাই শরীফ)


অন্য হাদীছ শরীফে এরশাদ হয়েছে -


وَ مَن مَاتَ وَ لَيسَ فىِ عُنُقِهِ بَيعَةُ مَاتَ مِيتَةَ جَاهِلِيَّةُ-
 

অর্থাৎ, যে ব্যক্তি এমতাবস্থায় মৃত্যু বরণ করলো যে, তার গর্দানে বাইয়া’তের (আনুগত্যের) বেড়ি থাকলো না, সে জাহেলীয়াতের মৃত্যুতে মৃত্যু বরণ করলো। (মুসলীম শরীফ: কিতাবুল ইমারা, হাদীছ নং-৪৮৯৯)।

পীর মাশায়েখগণের মধ্যে বাইয়া’ত করার যে প্রথা প্রচলিত তার সারমর্ম হলো জাহেরী ও বাতেনী আমলের ওপর দৃঢ়তা অবলম্বন করা এবং গুরুত্ব প্রদান করার অঙ্গীকার করা। তাঁদের পরিভাষায় একে বাইয়া’তে তরীকত, অর্থাৎ, তরীকতের কাজ বা আমল করার অঙ্গীকার করা। কেউ কেউ এ বাইয়া’তকে অস্বীকার করে থাকেন। কারণ হিসেবে বলেন যে হুজুর পাক (দ:) হতে তা বর্ণিত নেই। তখন শুধু কাফেরদেরকে ইসলামের বাইয়া’ত করার দরকার ছিল। কিন্তু উল্লেখিত হাদীছ শরীফে এ বিষয়ে স্পষ্ট প্রমাণ বিদ্যমান। তাই অনেক ইমাম মুজতাহিদ আলেমগণ বলেছেন- من ليس له شيخ فشيخه الشيطان ‘মান লায়ছা লাহু শায়খুন ফা-শায়েখুহুশ শয়তানুন’ ( জুনায়েদ বাগদাদী রহ:)। অর্থাৎ, যে ব্যক্তি কোনো হাক্কানী পীর বা শায়েখের বাইয়া’ত গ্রহণ করেনি, তার শায়খ বা ওস্তাদ হয় শয়তান। শয়তান-ই তাকে গোমরাহ বা বিভ্রান্ত করে দেয়। কাজেই গোমরাহী থেকে বাঁচা যেহেতু ফরজ, সেহেতু পীর-মুর্শিদের কাছে বাইয়া’ত হওয়া ছাড়া তা সম্ভব নয়। তাই পীর-মুর্শিদের কাছে বাইয়া’ত হওয়াও ফরজ। আর ঠিক এ কথাটি বলেছেন আমাদের হানাফী মজহাবের ইমাম, ইমাম আযম আবু হানিফা (রহ:)। তিনি বলেন, “লাওলা ছানাতানি লাহালাকান নোমান”। অর্থাৎ, “আমি নোমান বিন ছাবিত যদি দু’টি বছর না পেতাম তবে হালাক হয়ে যেতাম”। অর্থাৎ, যদি আমি আমার পীর সাহেব ইমাম জাফর সাদেক (রা:)-এর কাছে বাইয়া’ত হয়ে দু’টি বছর অতিবাহিত না করতাম, তবে আত্মশুদ্ধি লাভ না করার কারণে গোমরাহ ও হালাক (ধ্বংস) হয়ে যেতাম।


আর বিখ্যাত কবি, দার্শনিক ও আলেমকুল শিরোমণি বিশিষ্ট সুফি সাধক হযরত মাওলানা জালালুদ্দীন রুমী (রহ:) বলেন -


“মাওলানা রুম হারগেজ কামেল নাশুদ; তা গোলামে শামছে তিবরীজ নাশুদ”


অর্থাৎ, আমি মাওলানা রুমী ততোক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ-ওয়ালা হতে পারিনি যতোক্ষণ পর্যন্ত আমার পীর হযরত শামছে তাবরীজ (রহ:)-এর কাছে বাইয়া’ত হয়ে এলমে তাছাউফ আমল করে এখলাছ হাছিল না করেছি। অর্থাৎ, এলমে তাছাউফ আমলের মাধ্যমে এখলাছ অর্জন করার পরই আমি হাকীকি মু’মিন হতে পেরেছিলাম (মসনবী)।


তাই কাদেরীয়া তরীকার ইমাম হযরত গাউছুল আযম মাহবুবে ছোবহানী কুতুবে রব্বানী গাউছে সামদানী শায়খ মহিউদ্দীন আব্দুল কাদের জীলানী (রহ:) তাঁর বিখ্যাত কেতাব “সিররুল আসরার”-এর ৫ম অধ্যায়ে তওবার বয়ানে লিখেছেন, ক্বলব বা অন্তরকে জীবিত বা যাবতীয় কু-রিপু হতে পবিত্র করার জন্য আহলে তালকীন তথা পীরে কামেল গ্রহণ করা প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর জন্য ফরজ। কারণ তাওহীদের রত্ন (বীজ) কোনো যোগ্য মুর্শিদের অন্তর থেকে গ্রহণ করতে হবে।


হাদীস শরীফে যে এলেম অর্জন করা ফরজ বলা হয়েছে তা দ্বারা এলমে মারেফাত ও কোরবতকেই বোঝানো হয়েছে। এ ছাড়া আরও অন্যান্য সর্বজনমান্য ও সর্বজনস্বীকৃত ইমাম-মুজতাহিদ ও আওলিয়া ই-কিরামগণ (রহ:) পীর-মাশায়েখের কাছে বাইয়া’ত গ্রহণ করা ফরজ বলে ফতওয়া দিয়েছেন।


উদাহরণস্বরূপ, হুজ্জাতুল ইসলাম হযরত ইমাম গাজ্জালী (রহ:) তাঁর “এহইয়াউ উলুমুদ্দীন ও কিমিয়া সায়াদাত” কিতাবে, হযরত খাজা মুঈনুদ্দীন চিশতি আজমেরী (রহ:)-এর মালফুজাত “আনিসুল আরওয়াহ” কিতাবে, ইমামুশ শরীয়াত ওয়াত তরীকত শায়খ আবুল কাশেম কুশাইরী (রহ:) “রিছালায়ে কুশাইরিয়া” কিতাবে, হযরত মাওলানা কাজী ছানাউল্লাহ পানিপথি (রহ:) “মালাবুদ্দা মিনহু ও এরশাদুত্তালেবীন” কিতাবে, শাহ আব্দুল আজিজ মহাদ্দিস দেহলভী (রহ:) “তাফসীরে আজিজ” শীর্ষক কিতাবে, আল্লামা শামী (রহ:) “রদ্দুল মোখতার” কিতাবে, ইমাম ফখরুদ্দীন রাজী (রহ:) তাঁর “তাফসীরে কবীর” কিতাবে, কাইয়্যুমে আউয়াল আফজালুল আউলিয়া হযরত ইমাম মোজাদ্দেদে আলফে ছানী (রহ:) তাঁর বিখ্যাত আল-"মাকতুবাত শরীফে”, হযরত ইমাম আহমদ রেফায়ী (রহ:) তাঁর “বুনইয়ানুল মুআইয়্যাদ” কিতাবে, হযরত ইসমাঈল হাক্কি (রহ:) “তাফসীরে রুহুল বয়ানে” সরাসরি পীর গ্রহণ করা ফরজ বলে ফতুয়া দিয়েছেন।
 
এ প্রসঙ্গে কারামত আলী জৌনপুরীও তার “যাদুত তাকাওয
়াতে” লিখেছে যে এলমে তাছাউফ ছাড়া ইলমে শরীয়তের ওপর যথাযথ আমল করা কিছুতেই সম্ভব নয়। সুতরাং ছাবেত হলো যে এলমে মারেফত চর্চা করা সকলের জন্যই ফরজ বা অবশ্য কর্তব্য। আর এই এলেমে তাছাউফ পারদর্শী মুর্শিদে কামেল-এর সোহবত ও তা’লীম ব্যতিরেকে অর্জন করা কখনও সম্ভব নয়।

 
হাটহাজারী খারিজিদের মুরুব্বী মুফতী শফি সাহেব স্বয়ং নিজেই “মা’আরেফুল কুরআনে” সূরা বাক্বারায় উক্ত আয়াত শরীফের তাফসীরে লেখেন, আত্মশুদ্ধি অর্জিত হবে না যতোক্ষণ পর্যন্ত এছলাহ-প্রাপ্ত কোনো বুর্যুর্গ বা পীরে কামেলের অধীনে থেকে তালীম ও তরবিয়াত হাসিল না করবে। আমল করার হিম্মত তাওফিক কোনো কিতাব পড়া ও বোঝার দ্বারা অর্জিত হয় না, তা অর্জন করার একটি-ই পথ; আর তা হলো অলীগণের সোহবত তথা সান্নিধ্য।

 
পীর-মুর্শিদগণই হচ্ছেন হাকীকি আলেম। কেননা, পীর-মুর্শিদগণই এলমে শরীয়ত ও মারেফত, এই উভয় প্রকার এলমের অধিকারী। আর উক্ত উভয় প্রকারের এলমের অধিকারীগণই হচ্ছেন হাদীছ শরীফের ঘোষণা অনুযায়ী- العلماء ورثة الانبياء প্রকৃত আলেম বা ওয়ারাসাতুল আম্বিয়া। যেমন এ প্রসঙ্গে ইমামে রব্বানী মাহবুবে সুবহানী কাইয়ূমে আওয়াল সুলতানুল মাশায়েখ হযরত মোজাদ্দেদ আলফে ছানি (রহ:) তাঁর বিখ্যাত কিতাব ’মকতুবাত শরীফে’ উল্লেখ করেন, আলিমগণ নবীগণের ওয়ারিছ। এ হাদীস শরীফে বর্ণিত আলেম তারাই যাঁরা নবীগণের রেখে যাওয়া এলমে শরীয়ত ও এলমে মারিফত এই উভয় প্রকার এলমের অধিকারী। অর্থাৎ, তিনি-ই প্রকৃত ওয়ারিছ বা স্বত্বাধিকারী। আর যে ব্যক্তি শুধুমাত্র এক প্রকারের এলমের অধিকারী, সে নবীগণের প্রকৃত ওয়ারিশ নয়। কেননা, পরিত্যক্ত সম্পত্তির সকল ক্ষেত্রে অংশিদারী হওয়াকেই ওয়ারিছ বলে। আর যে ব্যক্তি পরিত্যক্ত সম্পত্তির কোনো নির্দিষ্ট অংশের অধিকারী হয়, তাকে ’গরীম’ বলে। অর্থাৎ, সে ওয়ারিছ নয়, গরীমের অন্তর্ভুক্ত। পক্ষান্তরে, যারা পীর-মাশায়েখ নয়, অর্থাৎ, শুধু এলমে শরীয়তের অধিকারী ও এলমে তাছাউফ-শূন্য, তারা প্রকৃত আলেম নয়।

 
অতএব, প্রমাণিত হলো, হক্কানী পীর-মাশায়েখগণই হচ্ছেন প্রকৃত বা খাঁটি আলেমে দ্বীন। ক্বলব জারি করতে হলে তাঁদের কাছে যেতে হবে। যে ব্যক্তি কোনো পীর-মাশায়েখের কাছে বাইয়া’ত হয়ে আত্মশুদ্ধি লাভ করে খিলাফত প্রাপ্ত হয়নি, তার কাছে বাইয়া’ত হওয়া অনুচিত।

 
অতএব, আত্মশুদ্ধি ও এলমে তাছাউফ অর্জন করা যেহেতু ফরজে আইন, আর কামেল পীর-মাশায়েখ ছাড়া এলমে তাছাউফ বা আত্মশুদ্ধি অর্জন করা সম্ভব নয়, সেহেতু একজন কামেল পীর-মুর্শিদ অন্বেষণ করে বাইয়া’ত গ্রহণ করা ফরজ। এটাই গ্রহণযোগ্য, বিশুদ্ধ ও দলীলভিত্তিক ফতওয়া। এর বিপরীত মত পোষণকারীরা বাতিল ও গোমরাহ।

 
ওয়ামা আলাইনা ইল্লাল বালাগ। ওয়াল্লাহু ওয়া রাসূলাহু আ’লামু

কামেল পীরের কাছে বায়া’ত হবার আবশ্যকতা

মহান প্রভু আল্লাহ্ তা’লার নামে আরম্ভ করছি। তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ রাসূল হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের প্রতি জানাচ্ছি অসংখ্য সালাত ও সালাম। তাঁর খাঁটি ও নির্মল আহলে বায়ত (পরিবার ও আত্মীয়-স্বজন), আসহাবে কেরাম (সম্মানিত সাথীবৃন্দ), আয্ওয়াজে মোতাহ্হারাত (পবিত্র বিবিগণ), সালাফে সালেহীন (পূর্ববর্তী বুযূর্গানে দ্বীন), মোতা’খেরীন (পরবর্তী যুগের পুণ্যবান জ্ঞান বিশারদবৃন্দ), বুযূর্গানে দ্বীন ও আউলিয়ায়ে কামেলীনের প্রতিও জানাচ্ছি আমাদের শত সহস্র সালাত-সালাম। বিশেষ করে আহলা দরবার শরীফের মহান আউলিয়ায়ে কেরাম, কুতুবে যমান হযরত কাজী আসাদ আলী সাহেব কেবলা (রহ:), হাজতে রওয়া, মুশকিল কোশা, সুলতানুল মোনাযেরীন হযরতুল আল্লামা শাহ্ সূফী আবুল মোকারেম মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম সাহেব কেবলা (রহ:) এবং আমার পীর ও মুরশিদ হযরতুল আল্লামা শাহ্ সূফী সৈয়দ আবু জাফর মোহাম্মদ সেহাবউদ্দীন খালেদ সাহেব কেবলা (রহ:)-এর প্রতি আন্তরিক সালাম ও শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করে এ লেখার প্রয়াস পাচ্ছি।

সৃষ্টির আদিতে রাব্বুল আলামীন খোদাতা’লা ছিলেন রহস্যের গুপ্ত ভাণ্ডার। এ প্রসঙ্গে একটি হাদীসে কুদসীতে তিনি এরশাদ ফরমান- “আমি ছিলাম রহস্যের গুপ্ত ভাণ্ডার। অতঃপর প্রকাশ হওয়ার বিষয়টি মনস্থ করলাম।” তাঁর এ প্রকাশ হবার প্রক্রিয়ায় তিনি ধরণীর বুকে তাঁরই খলীফা বা প্রতিনিধি প্রেরণের সিদ্ধান্তটি পাক কালামে ঘোষণা করেছেন। এরশাদ হয়েছে-

”আমি পৃথিবীতে আমার প্রতিনিধি প্রেরণকারী (সুরা বাকারা, ৩০ নং আয়াত)। আয়াতোল্লিখিত “প্রতিনিধি” শব্দটিকে তাফসীর গ্রন্থসমূহে আল্লাহ্ তা’লার নবী-রাসূল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। হযরত আদম (আ:) থেকে আরম্ভ করে সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত সকল নবী-রাসূলই মহান আল্লাহ পাকের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। আমাদের মহানবী (দ:) যে আল্লাহ্ পাকের মূল খলীফা বা প্রতিনিধি তা অপর এক হাদীসে কুদসীতে প্রমাণিত হয়। আল্লাহ্ তা’লা এরশাদ ফরমান- “হে রাসূল! আপনাকে সৃষ্টি না করলে আমি আসমানসমূহ তথা বিশ্বজগত সৃষ্টি করতাম না।” আমাদের উদ্ধৃত দুটো হাদীসে কুদসীতে প্রমাণিত হয় যে আল্লাহ্ তা’লা বিশ্বনবী (দ:)-এর মাধ্যমে প্রকাশিত হতে চেয়েছিলেন।

মাধ্যম দ্বারাই আল্লাহ্ তা’লা নিজেকে প্রকাশ করে থাকেন। পৃথিবীতে যা কিছু বিরাজমান তার সবই কোনো না কোনো মাধ্যম দ্বারা জারি হয়েছে বা আছে।  বস্তুতঃ মহান স্রষ্টা এভাবেই সৃষ্টি প্রক্রিয়া জারি করেছিলেন এবং এখনো তা জারি আছে। আল্লাহ্ পাক কুরআন মজীদে এরশাদ ফরমান -

 “হে মু’মিন (বিশ্বাসী)-গণ! আল্লাহকে ভয় করো (অর্থাৎ, পরহেযগার হও তথা সওয়াবদায়ক আমল পালন করো এবং হারাম বর্জন করো) ও তাঁর নৈকট্য অর্জনের জন্যে ওসীলা বা মাধ্যম অন্বেষণ করো (সূরা মায়েদা, ৩৮ আয়াত)।

মওলানা সূফী আবদুল হাকিম আরওয়াছী তুর্কী (রহ:) তাঁর কৃত ’রাবেতায়ে শরীফা’ শীর্ষক পুস্তিকায় এ প্রসঙ্গে লিখেছেন, “ওসীলাটি যে প্রকৃতপক্ষে রাসূলুল্লাহ্ (দ:), তা সূরা আলে ইমরানের ৩৯ আয়াতে বর্ণিত ঐশী আদেশে জানানো হয়েছে -

’যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো, তবে আমাকে অনুসরণ করো। আল্লাহ তোমাদেরকে ভালোবাসবেন’ (আল্ কুরআন)। ‘উলামায়ে হাক্কানী নবী (আ:)-গণের উত্তরাধিকারী’- হাদীসটি পরিস্ফুট করে যে আউলিয়াগণও ওসীলা” (রাবেতায়ে শরীফা)।

বস্তুতঃ আল্লাহ্ তা’লার ফয়েয ও মারেফাত অত্যন্ত তাজাল্লীপূর্ণ, ঠিক আগুনের মতো। কেউ যদি রুটি বানিয়ে সরাসরি আগুনে দেয়. তাহলে তা পুড়ে যাবে। কিন্তু যদি সে রুটি সেকার জন্যে তাবা ব্যবহার করে, তাহলে রুটি পুড়বে না। ঠিক তেমনি আল্লাহ্ তা’লার ফয়েয ও মারেফত অন্তরে গ্রহণ করতে হলে একজন কামেল পীর-মুরশিদের প্রয়োজন যিনি তাঁর মুরীদের অন্তরকে আল্লাহ তা’লার নূরের তাজাল্লী সহ্য করার ও গ্রহণ করার সামর্থ্য অর্জনে সহায়তা করতে সক্ষম। মুরীদের দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো, এ ক্ষেত্রে তার পীরের সাথে আত্মিক যোগাযোগ বজায় রাখা এবং তা থেকে বিচ্ছিন্ন না হওয়া। অর্থাৎ, তাকে নিজ পীরের প্রতি অগাধ বিশ্বাস রাখতে হবে ও পূর্ণ আস্থাশীল হতে হবে।

কামেল (পূর্ণতাপ্রাপ্ত) পীরের কাছে বায়া’ত হওয়া অপরিহার্য। কেননা, সূরা মায়েদাতে ওসীলা গ্রহণের আয়াতটি আজ্ঞাসূচক। এক্ষণে বায়া’ত হবার বিষয় সম্পর্কে ব্যাখ্যা করবো। আরবী ‘বায়া’ত’ শব্দের অর্থ বিক্রি হয়ে যাওয়া। এর ব্যবহারিক অর্থ কোনো কামেল পীরের কাছে ইসলামী প্রথানুযায়ী মুরীদ হওয়া বা শিষ্যত্ব গ্রহণ করা। এই ইসলামী প্রথা মহানবী (দ:)-এর সময় থেকেই চালু হয়েছে। কুরআন মজীদে এরশাদ হয়েছে-


”নিশ্চয় আল্লাহ সন্তুষ্ট হয়েছেন ঈমানদারদের প্রতি যখন তারা বৃক্ষের নিচে আপনার কাছে বায়া’ত গ্রহণ করছিলো (সূরা ফাতহ, ১৮ আয়াত)। একইভাবে সূরা ফাতহ ১০ নং আয়াতে এরশাদ হয়েছে -


”ওই সব মানুষ যারা আপনার কাছে বায়া’ত গ্রহণ করছে, তারা তো প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর কাছেই বায়া’ত গ্রহণ করছে; তাদের হাতগুলোর ওপর রয়েছে আল্লাহ্ তা’লার কুদরতের হাত” (আল্ কুরআন)। বায়া’তের এই ইসলামী প্রথা মহানবী (দ:)-এর বেসাল তথা আল্লাহ্ তা’লার সাথে পরলোকে মিলিত হবার পর হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা:), হযরত ওমর ফরুক (রা:), হযরত ওসমান যিন্নুরাইন (রা:) ও হযরত আলী (ক:) এবং তারও পরে তরীকতের পীর-মাশায়েখবৃন্দ জারি রাখেন। বায়া’ত কীভাবে গ্রহণ করা হতো তার বর্ণনা দিতে গিয়ে হযরত উবাদা ইবনে সামিত (রা:) বলেন, “রাসূলুল্লাহ (দ:) ঘোষণা করতেন: তোমরা আমার কাছে প্রতিশ্রুতি দাও ও শপথ করো যে তোমরা আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবে না, চুরি করবে না, অবৈধ যৌনাচার করবে না, তোমাদের সন্তানদের হত্যা করবে না, একে অপরের কুৎসা রটনা (গীবত) থেকে বিরত থাকবে, পাপাচার থেকে বিরত থাকবে; আর যে ব্যক্তি এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে, তার জন্যে পুরস্কার সর্বশিক্তমান ও মহান আল্লাহর তরফ থেকে থাকবে।’ অতঃপর আমরা মহানবী (দ:)-এর কাছে এ মর্মে প্রতিশ্রুতি দিতাম ও শপথ করতাম” (আল্ বুখারী ও মুসলিম)। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা:) এ বিষয়ে বলেন: “আমরা যখন মহানবী (দ:)-এর কাছে (খোদায়ী আজ্ঞা) শোনার ও মানার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতাম, তখন তিনি বলতেন, ‘তোমাদের সাধ্যানুযায়ী’ (আল্ বুখারী ও মুসলিম)।

বায়া’তের ইসলামী প্রথা সম্পর্কে দেওবন্দী মৌলভী আবুল হাসান নদভীও তার ’রিজালুল ফিকর ওয়াদু দাওয়া’ পুস্তকের ২৫৩ পৃষ্ঠায় লিখেছে, “সূফী তরীকার গাউস, হযরত বড় পীর আবদুল কাদের জিলানী (রহ:), হযরত মুহিউদ্দীন ইবনে আরবী (রহ:) এবং নকশবন্দী সিলসিলার পীর-মাশায়েখবৃন্দ বায়া’তের দরজা যতোটুকু সম্ভব উম্মুক্ত করে দিয়েছিলেন, যাতে করে প্রত্যেক সত্য ও একনিষ্ঠ বিশ্বাসী ব্যক্তি তাঁর জন্যে আত্মিকভাবে মূল্যবান কোনো বস্তু খুঁজে পান এবং সবাই যেন সর্বশক্তিমান ও মহান আল্লাহ্ তা’লার সাথে তাঁদের (পূর্ব) প্রতিশ্রুতির নবায়ন করতে পারেন। নকশবন্দী সিলসিলার এবং অন্যান্য সূফী তরীকার পীর-মাশায়েখবৃন্দ তাঁদের মুরীদদেরকে এমন এক সত্যবাদিতার মাকামে (পর্যায়ে) উন্নীত করেছিলেন, যেখানে তারা বায়া’তের দায়িত্ব উপলব্ধি ও অনুভব করতে পেরেছিলেন এবং নিজেদের বিশ্বাসকে পুনরুজ্জীবিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।”

কামেল পীরের বৈশিষ্ট্য

একজন কামেল পীরের বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে প্রথমটি হলো তাঁকে আল্লাহ্ তা’লার নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দা (কুরবাত) ও রাসূলুল্লাহ্ (দ:)-এর নায়েব (প্রতিনিধি) হিসেবে দ্বীনের (ধর্মের) যাহেরী (প্রকাশ্য) এবং বাতেনী (আধ্যাত্মিক) জ্ঞানে একজন আলেম বা জ্ঞান বিশারদ হতে হবে। মোট কথা, ইসলামী জ্ঞানের সকল শাখায় তাঁর অগাধ জ্ঞান থাকতে হবে। তাঁকে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা-বিশ্বাস সম্পর্কেও জানতে হবে। দ্বিতীয়তঃ তাঁকে আরেফ বা ভেদের রহস্য সম্পর্কে জ্ঞানী হতে হবে।  তাঁর ইহ্সান অবস্থা সম্পর্কে জ্ঞান থাকতে হবে, যেমন মহানবী (দ:) এরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহর এবাদত এমনভাবে করো যেন তুমি তাঁকে দেখতে পাচ্ছো, আর যদি না দেখতে পাও তবে এটি জানো যে তিনি তোমাকে দেখছেন” (আল হাদীস)। একজন আরেফ তাঁর অন্তরে সাক্ষ্য দেবেন যে আল্লাহ্ তা’লা তাঁর যাত মোবারক, গুণাবলী ও কর্মে এক ও অনন্য। তৃতীয়তঃ কামেল পীর তাঁর পীরের তত্ত্বাবধানে ইতোমধ্যেই পরিশুদ্ধ।  তাঁকে নফস তথা একগুঁয়ে সত্তার বিভিন্ন স্তর বা পর্যায়, রোগ ও ত্রুটি-বিচ্যুতি সম্পর্কে ওয়াকেফহাল হতে হবে। শয়তান কোন্ কোন্ পদ্ধতিতে কলব্ বা অন্তরে প্রবেশ করতে পারে তাও তাঁকে জানতে হবে। তাঁর মুরীদদের পরিশুদ্ধ করা এবং কামেলিয়াত বা পূর্ণতার পর্যায়ে উন্নীত করার সকল পদ্ধতিও তাঁর জানা থাকা প্রয়োজন। চতুর্থতঃ তরীকতের পথে অনুসারীদের পথ দেখানোর ক্ষেত্রে একজন কামেল পীরের প্রয়োজন তাঁর পীর কেবলার এজাযত বা অনুমতি। বস্তুতঃ একজন কামেল পীরের বৈশিষ্ট্য ও গুণ হলো তাঁকে দেখলেই আল্লাহর কথা স্মরণ হবে, তাঁর কথাবার্তা শুনলে ঈমান সজীব ও চাঙ্গা হয়ে উঠবে।

পীরের প্রতি মুরীদের পালিত আদব

জেনে রাখ: মুরীদের জন্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়মগুলোর একটি হলো তার শায়খ তথা পীরের প্রতি আদবশীলতা রক্ষার ব্যাপারে যত্নবান হওয়া; কেননা, এই আচরণ-সচেতনতা অন্তরে ভালবাসা সৃষ্টি করে। এটা বাস্তব যে তোমার আচার-ব্যবহারের সৌন্দর্যের মাঝে তোমার আত্মার সৌন্দর্য ও তোমার মেধা বা বুদ্ধিবৃত্তির পূর্ণতা দৃশ্যমান হয়। তুমি সর্বদা তোমার শায়খের প্রতি আদবশীল হলে তাঁর অন্তরে তোমার প্রতি ভালবাসা পয়দা হবার ফলে সেখানে তোমার একটি স্থানও নির্দিষ্ট হবে; আর এরই ফলশ্রুতিতে খোদা তা’লার করুণাও তোমার প্রতি বর্ষিত হবে। মহান আল্লাহ্ পাক তাঁর বন্ধু (ওলী)-দের অন্তরগুলোতে রহমত (করুণা) ও যত্নের দৃষ্টি রাখেন। মুরীদ যদি পীরের অন্তরে স্থায়ী আসন করে নিতে পারে, তবে স্থায়ী খোদায়ী করুণা ও আশীর্বাদ তারই প্রাপ্য হবে। তোমার শায়খ কর্তৃক তোমাকে কবুল করার চিহ্ন হবে এই যে তোমার প্রতি তাঁর আর কোনো আপত্তি থাকবে না, যা আল্লাহ্, তাঁর রাসূল (দ:) ও সকল পীর-মাশায়েখ যাঁরা তোমার শায়খ ও রাসূলুল্লাহ্ (দ:)-এর মধ্যকার সিলসিলাগত যোগসূত্র, তাঁদের কাছে তোমার কবুল হবার সুস্পষ্ট প্রমাণ।

শুধু সুন্দর আদব-কায়দা ও আচরণ দ্বারাই তোমার পীরের প্রতি কিছু কিছু দায়িত্ব পালন করা যায়। ধর্মীয় জ্ঞান বিশারদ তথা পীর মাশায়েখবৃন্দ যাঁরা তোমাদের রূহানী পিতা, তাঁদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে তোমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য সম্পন্ন করো;  এতে অবহেলা  চরম অবজ্ঞা ও অমান্য করার প্রবণতা ছাড়া আর কিছু নয়। একটি হাদীসে আমাদের মহানবী (দ:) এরশাদ ফরমান- “যে ব্যক্তি মরুব্বীদের সম্মান করে না এবং ছোটদের আদর করে না এবং উলামায়ে হক্কানী-রব্বানীদের হক তথা অধিকার স্বীকার করে না, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।” তুমি যদি তোমার শায়খের অধিকারকে অবহেলা করো, যিনি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তাঁর অধিকার দ্বারা আল্লাহ্ তা’লার অধিকারের প্রতিনিধিত্ব করেন, তবে তুমি খোদা তা’লার  প্রতি কর্তব্য পালনেও ব্যর্থ হবে; কেননা, “তোমার মুরশিদের প্রতি কর্তব্যে অবহেলা করলে তুমি আল্লাহর কাছে পৌঁছুতে পারবে না।” একজন শায়খ তাঁর মুরীদানদের মধ্যে সেই রকম হেদায়াতকারী যেমনটি নবী (দ:) তাঁর উম্মতের মাঝে। যখন পীর সাহেব তোমাকে রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর পথ অনুসরণের আহ্বান জানান, তখন তিনি বিশ্বনবী (দ:)-এর প্রতিনিধি। যথা- এরশাদ হয়েছে:

”আশ্ শায়খু ফী কওমিহী কান্ নবীয়্যে ফী উম্মাতিহী”
অর্থাৎ, “একজন পীর তাঁর (অনুসারী সিলসিলাধারী) মুরীদানদের জন্যে সেই রকম হেদায়াতকারী, যেমনটি নবী (দ:) তাঁর উম্মতের মাঝে।”

আমার জ্ঞানে বর্তমানে মুরীদের জন্যে পনেরোটি আদব রয়েছে যা সে তার পীরের প্রতি পালন করবে। এ আদবগুলো একাধারে আম (সার্বিক) ও খাস্ (সুনির্দিষ্ট) উভয়ই।

প্রথম আদবটিতে এই বিশ্বাস ব্যক্ত হয়েছে যে তোমার জ্ঞান অর্জন, হেদায়েত (পথ প্রদর্শন), প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা-দীক্ষা সবই তোমার পীর দেখা শোনা করবেন। তুমি যদি কাউকে তাঁর সাথে তুলনীয় মনে করো বা ওই ব্যক্তিকে আরও পূর্ণতাপ্রাপ্ত মনে করো, তাহলে বোঝা যাবে তোমার শায়খের সাথে তোমার ভালবাসা ও টানের সম্পর্ক দুর্বল এবং এই কারণেই তোমার পীরের কথা ও তাঁর আধ্যাত্মিক হাল বা অবস্থাগুলো তোমার ওপর সামান্য প্রভাব ফেলবে। তাঁর কথা ও আদেশকে তোমার ওপর প্রভাব ফেলতে হলে এবং তাঁর হালতগুলোকে তোমার উপলদ্ধি করতে হলে যে জিনিসটি প্রয়োজন তা হলো মুহব্বত (ভালবাসা)। তোমার ভালবাসা যতো বেশি পূর্ণতা পাবে ও গভীর হবে ততোই তাঁর শিক্ষাগুলো তোমার বোধগম্য হতে থাকবে।

দ্বিতীয় আদবটি হলো তোমার শায়খের আদেশ-নিষেধ মান্য করার বেলায় তোমার স্থির সিদ্ধান্ত ও অটল থাকা। তোমার এটা জানা উচিৎ যে, তাঁকে মানা ও তাঁর খেদমতে ধারাবাহিকতা বজায় রাখার মাঝেই খোদায়ী করুণার দ্বার অবারিত হবে। ‘হয় আমি পীরের দোরগোড়ায় জান দেবো, নয়তো লক্ষ্যে পৌঁছাবো।’ এর লক্ষণ হলো, যখন পীর সাহেব তোমাকে কোনো বিষয়ে ‘না’ বলেন বা দূরে সরিয়ে দেন, তখন তুমি তাঁর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে না। কেননা, তোমার আধ্যাত্মিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করার জন্যে সময়ে সময়ে তিনি তোমাকে পরীক্ষা করবেন।

আবু উসমান হিরী (বেসাল ২৯৮ হিজরী/৯৬০-১১ খৃষ্টাব্দ; খোরাসানী সূফীদের নক্ষত্র) তাঁর পীর শাহ কেরমানী (বেসাল ৩০০ হিজর/৯১২-১৩ খৃষ্টাব্দ; আবু তোরাব নক্শাবীর মুরীদ)-এর আদেশ অনুসারে আবু হাফসে হাদ্দাদ (বেসাল ২৭০ হিজরী/৮৮৩-৪ খৃষ্টাব্দ বা তারও আগে; তিনি মালামাতিয়া তথা দায় বহনের তরীকার অনুসারী)-কে দেখতে নিশাপুরে আসেন। আবু হাফসে হাদ্দাদের ঐশী পরশময় চাহনি আবু উসমানকে এতোই আকর্ষণ করলো যে তিনি তাঁর জালে আটক হয়ে গেলেন। নিশাপুর থেকে ফেরার সময় হলে আবু উসমান তাঁর পীর শাহ কেরমানীর কাছে নিশাপুরে থাকার অনুমতি চান। এ সময় তিনি তাঁর পূর্ণ যৌবনে ছিলেন। আবু হাফস্ হাদ্দাদ অবশ্য তাঁকে দূরে সরিয়ে দিলেন এ কথা বলে, “আমার সোহবতে (সান্নিধ্যে) বসার কোনো অনুমতি তোমার নেই।” আবু উসমান এই সিদ্ধান্ত মেনে তাঁকে সামনে রেখে পেছনের দিকে হেঁটে বেরিয়ে এলেন যতোক্ষণ না শায়খ আবু হাফস্ দৃষ্টির বাইরে চলে গেলেন। অতঃপর আবু উসমান শায়খের দরজার বাইরে একটি গর্ত খুঁড়ে সেখানে বসে গেলেন এই নিয়্যতে যে আবু হাফস্ তাঁকে না গ্রহণ করা ও না ডাকা পর্যন্ত তিনি সেখান থেকে নড়বেন না। আবু হাফস্ তাঁর এ নিষ্ঠাপূর্ণ নিয়্যত দেখে তাঁকে কাছে ডাকলেন ও তাঁর বিশেষ সঙ্গীদের একজন হিসেবে তাঁকে গ্রহণ করলেন; অতঃপর তাঁকে নিজ কন্যার সাথে বিয়ে দিলেন ও উত্তরাধিকারী হিসেবে খেলাফত দান করলেন। শায়খের বেসালের পরে আবু উসমান ত্রিশ বছর সাজ্জাদানশীন খলীফা ছিলেন।

তৃতীয় আদবটি হলো, তোমার শায়খের পছন্দ-অপছন্দের মাঝে নিজেকে তুমি সমর্পিত করবে। মুরীদ হিসেবে তোমার ব্যক্তিগত বিষয়ে কিংবা মালিকানাধীন সম্পদের ব্যাপারে তোমার পীরের প্রতিটি সিদ্ধান্ত তোমাকে মেনে চলতে হবে এবং এতে সমর্পিত ও সন্তুষ্ট থাকতে হবে। এটাই একমাত্র পথ যা দ্বারা তুমি তাঁর অমূল্য মনোযোগ আকর্ষণ ও ভালবাসা অর্জন করতে সক্ষম হবে। তোমার আন্তরিকতা ও নিষ্ঠা পরিমাপের এটাই হলো মাপকাঠি - যেমনিভাবে আল্ কুরআনে বিবৃত হয়েছে- “অতএব, হে মাহবুব! আপনার প্রতিপালকের শপথ, তারা মুসলমান হবে না যতোক্ষণ পরস্পরের ঝগড়ার ক্ষেত্রে আপনাকে বিচারক না মানবে; অতঃপর যা কিছু আপনি নির্দেশ করবেন, তাদের অন্তরসমূহে সে সম্পর্কে কোনো দ্বিধা থাকবে না এবং সর্বান্তঃকরণে তা মেনে নেবে” (সুরা নিসা, ৩৫ আয়াত)।

চতুর্থ আদব শর্তারোপ করে যে তুমি তোমার পীরের সমালোচনা করবে না। নিজ পীরের পছন্দ-অপছন্দ ও সিন্ধান্তগুলোর সমালোচনায় প্রবৃত্ত হওয়া মুরীদের উচিৎ নয়- তা অন্তরে হোক বা প্রকাশ্যেই হোক। তোমার পীরের কোনো কিছু অস্পষ্ট মনে হলে সর্বদা মূসা (আ:) ও খিযির (আ:)-এর ঘটনাটির কথা স্মরণ করবে (সূরা কাহাফ, ৬০-৮২ আয়াতসমূহ)। এতে বর্ণিত হয়েছে যে হযরত মূসা (আ:) আল্লাহর নবী ও মহাজ্ঞানী এবং খিযির (আ:)-এর প্রতি ভক্ত-অনুরক্ত হওয়া সত্ত্বেও তাঁর কিছু কাজের সামলোচনা করেছিলেন; কিন্তু ওগুলোর অন্তর্নিহিত অর্থ জানার পর নিজ ধারণা পরিবর্তন করেছিলেন। তোমার শায়খের কোনো কাজ যদি তোমার বোধগম্য না হয়, তবে তোমার বলা উচিৎ যে তোমার উপলব্ধি ক্ষমতা ও জ্ঞান সীমাবদ্ধ; আর এটি কোনোক্রমেই তোমার পীরের ভুল-ত্রুটি বা ভ্রান্ত আচরণের ব্যাপার নয়। ফলে তোমার পীরের সাথে তোমার সম্পর্কে ফাটল ধরার সম্ভাবনা থেকে তুমি মুক্ত থাকবে এবং তাঁর মুহব্বতেও ঘাটতি পড়বে না। একবার হযরত জুনাইদ বাগদাদী (রহ: - বেসাল ৯১০ খৃষ্টাব্দ)-কে জনৈক মুরীদ একটি প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে এবং তাঁর উত্তর পাবার পরে এর সমালোচনা করে। হযরত জুনাইদ (রহ:) তখন কুরআন মজীদের একটি আয়াতে করীমা পড়ে শোনান:

”আর তোমরা যদি আমাকে বিশ্বাস না করো, তাহলে আমার কাছ থেকে সরে যাও” (সূরা দুখান, ২১ আয়াত)।

পঞ্চম আদবটি হলো, তুমি তোমার নিজস্ব পছন্দ-অপছন্দ পরিহার করবে। পীর কী চান বা কী পছন্দ করেন তা না জেনে মুরীদের কোনো কাজই করার অনুমতি নেই- চাই সেই কাজ হোক ধর্মীয় বা বৈষয়িক, আম (সার্বিক) কিংবা খাস (সুনির্দিষ্ট)। তাঁর অনুমতি ছাড়া তুমি পানাহার করবে না, সুন্দর সুন্দর জামাকাপড় পরবে না, উপহার দেবে না, ঘুমোবে না, কিছু নেবেও না, দেবেও না। তোমার শায়খের অনুমতি ও নির্দেশ ছাড়া কোনো ধর্মীয় কাজেও জড়াবে না। এক রাতে রাসূলে পাক (দ:) হযরত আবু বকর (রা:)-এর বাসার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন; এমতাবস্থায় তিনি হযরত আবু বকর (রা:)-কে রাতের নামাজে নিচু স্বরে কুরআন তেলাওয়াত করতে শুনতে পেলেন। অতঃপর তিনি হযরত উমর (রা:)-এর বাসার পাশ দিয়ে যাবার সময় তাঁকে রাতের নামাযে উচ্চস্বরে কুরআন তেলাওয়াত করতে শুনলেন। সকালে যখন উভয়েই রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর দরবারে হাজির হলেন, তিনি হযরত আবু বকর (রা:)-কে জিজ্ঞেস করলেন কেন তিনি নিচু স্বরে কুরআন তেলাওয়াত করেছিলেন। হযরত আবু বকর (রা:) উত্তর দিলেন, “আমি যাঁর সাথে আলাপ করি তাঁর কথা শুনি।” হযরত ওমর (রা:)-কে তাঁর উচ্চস্বরে কুরআন তেলাওয়াতের কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিন উত্তর দেন, “আমি শয়তানকে তাড়িয়ে দেই এবং যারা ঘুমোয় তাদেরও জাগিয়ে দেই।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (দ:) তাঁদের দু’জনকে উচ্চস্বর বা নিচু স্বর কোনোটিতেই তা করতে বারণ করলেন বরং মধ্যম রাস্তা অনুসরণ করতে বল্লেন। এমতাবস্থায় কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ হলো- “এবং আপন নামায না খুব উচ্চস্বরে পড়ো, না একেবারে ক্ষীণ স্বরে এবং এই দুয়ের মধ্যবর্তী পথ সন্ধান করো” (সুরা বনী ইসরাইল, ১১০ আয়াত)। এতে প্রমাণিত হয় যে তোমার যদি আধ্যাত্মিক পীর তথা পথপ্রদর্শক থাকেন, তবে তোমার উচিৎ হবে না নিজের উপলব্ধি অনুযায়ী চলা। এটা আধ্যাত্মিক জগতের প্রকৃত উপলদ্ধির বেলায়ও প্রযোজ্য হবে।

যষ্ঠ আদবটি  হলো, তোমার শায়খের চিন্তাধারাকে মেনে চলতে হবে। শায়খের চিন্তা-ভাবনাকে প্রত্যাখ্যান করে, এমন কোনো কিছুতে মুরীদের ব্যাপৃত হওয়া উচিৎ নয়। তাঁর চিন্তা-ভাবনাকে কম গুরুত্বপূর্ণ মনে করা তোমার উচিৎ নয়। কেননা, তোমার শায়খের দয়া, সম্পূর্ণ ক্ষমা, বন্ধুত্ব ও ক্ষমাশীলতার ওপর তুমি নির্ভরশীল। শায়খের সচেতন মনে প্রত্যাখ্যান কিংবা গ্রহণের কারণে যা কিছু প্রবেশ করে তা মুরীদের সত্তার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।

সপ্তম আদব তোমার কাছে এটা দাবি করে যে তুমি স্বপ্নে যা দেখ তা তুমি তোমার পীরকে বলবে ও সেগুলোর ব্যাখ্যা চাইবে। স্বপ্নের ব্যাখ্যার ব্যাপারে পীরের ওপর নির্ভর করবে; হতে পারে এসব স্বপ্ন জাগ্রত অবস্থায় কিংবা ঘুমে। এগুলোতে কোনো ক্ষতি নেই মর্মে নিজে নিজে সিদ্ধান্ত নেবে না। এ সব স্বপ্ন হয়তো তোমার আত্মার গোপন আকাঙ্ক্ষা থেকেও সম্ভব হতে পারে এবং তুমি সেগুলোকে সেভাবে বিচার নাও করতে পারো ও ক্ষতিকর নাও মনে করতে পারো। এটা প্রকৃত চিত্র নাও হতে পারে। তবে তুমি যখন তোমার পীরকে এগুলো সম্পর্কে বলবে এবং তিনি তাঁর সুগভীর জ্ঞান দ্বারা এগুলোর সাথে পরিচিত হবেন, তখন বাস্তবিকভাবে এগুলো কখন ক্ষতিকর নয় তা বুঝতে তোমার পীরের মতামত তোমাকে সাহায্য করবে। এটা যখন আঘাতের ইঙ্গিত বহন করবে, তখন তাও বোঝা যাবে।

অষ্টম আদবটি তোমার কাছে এটা দাবি করে যে তুমি তোমার পীরের কথা কান দিয়ে শুনবে। শায়খের ঠোঁট থেকে যা বের হয়ে আসবে তা শোনার জন্যে মুরীদের উচিৎ অপেক্ষা করা ও তাতে মনোযোগী হওয়া। তার উচিৎ নিজ শায়খের জিহ্বাকে খোদা তা’লা ভাষণের অভিব্যক্তি মনে করা এবং এই বিশ্বাস পোষণ করা যে তিনি নিজ আকাঙ্ক্ষা হতে কিছু বলেন না বরং যা বলেন তা “খোদা বান্দার মাধ্যমে কথা বলেন” এমন মাকামে উন্নীত হয়েই ব্যক্ত করেন। তোমার উচিৎ তাঁর হৃদয়কে আধ্যাত্মিক জ্ঞানের মণিমুক্তাসমৃদ্ধ একটি মহাসাগর মনে করা; যে মহাসাগর প্রাক-অনন্তকালের খোদায়ী ইচ্ছার বায়ুপ্রবাহে এ সব রত্নের কিছু কিছুকে পীরের সৈকতসম জিহ্বায় ভাসিয়ে নিয়ে আসে।

অতএব, তোমার উচিৎ এ ব্যাপারে যত্নবান ও মনোযোগী হওয়া যাতে করে তোমার জন্যে উপকারী হতে পারে পীরের এমন কথা শোনা থেকে তুমি বঞ্চিত না হও।

তোমার নিজের হাল তথা অবস্থার সাথে তোমার পীরের প্রতিটি কথাকে তুমি সমন্বয় সাধন করতে চেষ্টা করবে। এ কথা তুমি চিন্তা করবে যে খোদার দরবারে তোমার কল্যাণের জন্যে তুমি একটি দরখাস্ত পেশ করছো গ্রহণোম্মুখ জিহ্বা সহকারে; আর এই গ্রহণোম্মুখতার পরিপ্রেক্ষিতে গায়েব থেকে তোমার প্রতি একটি ভাষণ অবতীর্ণ হয়েছে। নিজ পীরের সাথে কথা বলার সময় তুমি নফসানীয়াত (একগুঁয়ে সত্তা) ত্যাগ করবে; নিজ জ্ঞান ও ঐশী অন্তর্দৃষ্টিকে সদ্ব্যবহার করে তোমার উচিৎ হবে কপটতা ত্যাগ করা এবং নিজেকে পূর্ণ ও সুন্দর হিসেবে পেশ করা। কেননা, যখন তুমি নিজেকে ব্যক্ত করতে চেষ্টা করবে ও কথা বলার সুযোগের অপেক্ষায় থাকবে, তখনই তুমি নিজেকে মুরীদের অবস্থান থেকে সরিয়ে ফেলবে এবং শায়খের কথা শোনার ক্ষেত্রে নিজেকে বধির বানিয়ে ফেলবে। কুরআনের আয়াত-

’হে ঈমানদারবৃন্দ! আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (দ:)-এর আগে বেড়ো না’ (সূরা হুজুরাত, ১ম আয়াত)। এ আয়াতের শানে নুযূল তথা প্রেক্ষাপট হিসেবে কিছু কিছু তফসীরকার লিখেছেন যে রাসূলে খোদা (দ:)-এর সাহচর্যে এমন কিছু মানুষ ছিলেন যারা হুজুর পাক (দ:)-কে কেউ কোনো প্রশ্ন করলে উত্তর হিসেবে নিজেদের মতামত পেশ করার অভ্যাস গড়ে তুলেছিলেন। এ আয়াত অবতীর্ণ হয়ে তা যে ভুল ও নিষিদ্ধ তা প্রমাণ করেছে।

নবম আদবটি শর্তারোপ করে যে তুমি তোমার কণ্ঠস্বর পীরের উপস্থিতিতে নিচু ও মোলায়েম রাখবে। তাঁর সান্নিধ্যে কখনো উচ্চস্বরে কথা বলবে না; কেননা এটা সৌজন্যের খেলাফ। এটা আপন মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত করার মতোই ব্যাপার। এ শিক্ষাটা দেয়ার জন্যেই কুরআনের আয়াত নাযেল হয়েছে- “হে ঈমানদারবৃন্দ! নিজেদের কণ্ঠস্বরকে ওই অদৃশ্যের সংবাদদাতা (নবী)-র কণ্ঠস্বরের চেয়ে উঁচু করো না” (সূরা হুজুরাত, ২য় আয়াত)। অতঃপর সাহাবায়ে কেরাম তাঁদের কণ্ঠস্বর এতোই নিচু করেন যে তাঁদের কথাবার্তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় কুরআনের আয়াত নাযেল হয়- “নিশ্চয় ওই সমস্ত মানুষ যারা আপন কণ্ঠস্বরকে আল্লাহর রাসূলের দরবারে নিচু রাখে, তাদেরকে আল্লাহ পাক তাদের খোদাভীরুতার বেলায় পরীক্ষা করে নিয়েছেন; তাদের জন্যে ক্ষমা ও মহা পুরস্কার রয়েছে” (সূরা হুজুরাত, ৩য় আয়াত)।

দশম আদবটি তোমাকে তোমার আচরণে অবহেলা প্রদর্শন করতে বারণ করে। তোমার শায়খের সাথে কথায় বা কাজে খুব ফ্রি বা খোলামেলা আচরণ অনুমতিপ্রাপ্ত নয়; কেননা তাতে বিনয়ীভাব তিরোহিত হবে এবং যথাযথ আচরণও দূর হয়ে যাবে এবং এরই ফলশ্রুতিতে করুণা প্রবাহও বিঘ্নিত হবে। তোমার উচিৎ হবে তাঁকে সম্মানসহ সম্বোধন করা, যেমন- ইয়া শায়খী (হে আমার পীর) ইত্যাদি।

মহানবী (দ:)-এর সাহাবায়ে কেরাম প্রথম দিকে তাঁকে সম্বোধনের সময় সম্মানসহ তা করতেন না। তাঁরা বলেতন ‘মোহাম্মদ’ কিংবা ‘আহমদ’ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)। এমতাবস্থায় এটা নিষেধ করে কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ হয়: “রাসূল (দ:)-কে সম্বোধন করার সময় সেভাবে চিৎকার করো না যেভাবে একে অপরের প্রতি করে থাকো, যাতে তোমাদের আমলসমূহ বরবাদ না হয়ে যায়” (সূরা হুজুরাত, ২ নং আয়াত)। অতঃপর সাহাবায়ে কেরাম তাঁকে ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ্’ (হে আল্লাহর রাসূল) বলে সম্বোধন করতেন। বানু তামীম গোত্রের কতিপয় প্রতিনিধি একবার মহানবী (দ:)-এর ঘরের সামনে গিয়ে জোরে চিৎকার দিয়ে বলে, “হে মোহাম্মদ! আামদের কাছে বেরিয়ে আসুন!” এতে কুরআনের আয়াত নাযেল হয়- “নিশ্চয় ওই সব লোক যারা আপনাকে হুজরাসমূহের  (প্রকোষ্ঠ) বাইরে থেকে আহ্বান করে তাদের মধ্যে অধিকাংশই নির্বোধ এবং যদি তারা ধৈর্য ধারণ করতো আপনি তাদের কাছে বের হওয়া পর্যন্ত, তবে তা তাদের জন্যে ভাল হতো।” (সূরা হুজুরাত, ৪-৫ আয়াত)। তোমার পীরের সাথে কথাবর্তা  বলার সময় যেমন তুমি খোলামেলা হবে না, তেমনি কাজে কর্মেও তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করাকে তোমার কর্তব্য মনে করবে। তাই পীরের দরবারে তোমার জায়নামাজ শুধু নামাযের সময় হলেই বিছিয়ে দেবে। তাঁর সামনে সূফীবৃন্দের সেমা (কাওয়ালী/মরমী সংগীত) শোনার সময় যতোক্ষণ তোমার নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে, ততোক্ষণ চিৎকার বা ওয়াজদ (দৈনিক স্পন্দন) করবে না। হাসাহাসিও করবে না।

এগারোতম আদব তোমার প্রতি শর্তারোপ করে যে, কথা বলার সঠিক সময়টুকু তোমার জানা প্রয়োজন। মুরীদ যখন ধর্মীয় বা বৈষয়িক গুরুত্বপূণ বিষয় সম্পর্কে আলাপ করতে চায়, তখন তার উচিৎ এটা দেখে নেয়া যে তার পীর এ ব্যাপার তার মূল্যবান সময় দিতে রাজি আছেন কিনা; অর্থাৎ, তিনি মুরীদের কথা শুনতে ইচ্ছুক কিনা। তোমার শায়খের সাথে কথা বলার সময় তোমার তাড়াহুড়ো করা উচিৎ নয়। আল্লাহর অনুগ্রহ ও করুণা কামনা করো যাতে করে আদব পালনের ক্ষেত্রে কোনো ভুল-ত্রুটি না হয়ে যায়, কোনো বেয়াদবী না হয়ে যায়। এ সময় খোদা তা’লার এতো নিকটবর্তী হওয়ার কারণে পীরের দরবারে হাদিয়া পেশ করা যথোচিৎ হবে। মহানবী  (দ:)-এর দরবারেও তাঁর সাহাবায়ে কেরাম তাঁর কাছে কিছু আরয করার আগে এ রকম হাদিয়া পেশ করতেন, যেমনিভাবে কুরআন মজীদে ঘোষিত হয়েছে; “হে ঈমানদারবৃন্দ! তোমরা যখন রাসূল (দ:)-এর কাছে কোনো কথা গোপনে আরয করতে চাও, তবে তা করার আগে কিছু সাদকাহ্ (হাদিয়া) পেশ করো (রাসূলের কাছে)” (সূরা মুজাদালা, ১২ আয়াত)।

উপরোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসীরকার শিরোমণি হযরত ইবনে আব্বাস (রা: বেসাল- ৬৮৭/৯০ খৃষ্টাব্দ) বলেন: “এ আয়াতটি অবতীর্ণ হবার কারণ হলো মানুষেরা হুজুর পূর নূর (দ:)-এর দরবারে হাজির হয়ে মাত্রাতিরিক্ত পীড়াপীড়িমূলক প্রশ্ন করতো এবং তাঁকে পেরেশান করতো।”

বারোতম আদব দাবি করে যে তুমি তোমার আধ্যাত্মিক মকামের সীমানাগুলো পাহারা দেবে। পীরকে প্রশ্ন করার সময় মুরীদের উচিৎ নিজ মকামের সীমা বজায় রাখা। শুধু তোমার আধ্যাত্মিক অবস্থা-সম্পর্কিত তোমার কাছ থেকে গোপন বা আড়াল যে কোনো বিষয় সম্পর্কেই তুমি তাঁর কাছে ব্যাখ্যা চাইতে পারবে। অন্যান্য বিষয় সম্পর্কে প্রশ্ন করো না; এটা তোমার মকাম বা হালের সাথে সম্পর্কিত এমন বিষয়গুলোর বেলায়ও প্রযোজ্য। অতএব, এগুলো সম্পর্কে পীরের সাথে আলাপ করো না; কেননা এগুলো উপকারী নয়, এমন কি ক্ষতিকরও হতে পারে। তোমার আধ্যাত্মিক অবস্থার সাথে যা কিছু জড়িত শুধু সে সম্পর্কেই প্রশ্ন করবে। এ ধরনের বাহুল্য প্রশ্নের ব্যাপারে কুরআন মজীদে এরশাদ হয়েছে- “হে ঈমানদারবৃন্দ! তোমরা এমন সব বিষয়ে প্রশ্ন করো না, যেগুলো তোমাদের কাছে প্রকাশ করা হলে তোমাদের খারাপ লাগবে” (সূরা মাঈদাহ, ১০১ আয়াত)। উপকারী কথা হলো তা-ই যা শ্রোতার উপলব্ধি ক্ষমতার অনুকূল। আর উপকারী প্রশ্ন হলো তা-ই যা উত্তর শ্রবণকারীর মকামের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

তেরোতম আদব হলো তুমি তোমার পীরের গোপন রহস্য সম্পর্কে চুপ থাকবে। অলৌকিক ক্ষমতা, স্বপ্ন ও অন্যান্য আধ্যাত্মিক বিষয় যা তোমার পীর গোপন রেখেছেন, তা প্রকাশ করার জন্যে তুমি অনুমতি  চাইবে না। কেননা, এগুলো গোপন রাখার মাঝে তোমার পীর কোনো ধর্মীয় কিংবা দুনিয়াবী কল্যাণ দেখতে পেয়েছেন যা সম্পর্কে তুমি অবগত নও। এগুলো প্রকাশ করলে ক্ষতি হতে পারে।

এ আদবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে মুরীদের সেই সব গোপন বিষয় যা পীরের জানা এবং যা পীরের কাছে গোপন রয়েছে। নিচের পংক্তিগুলো তাঁর হাল বর্ণনা করে:

’অনেক আন্তরিক ও মহৎ মানুষ আমার জানা,

যাদের গোপন বিষয় আমি অন্যদের থেকে করেছি আড়াল,

এসব যবে আমি রেখেছি আমা মাঝে লুকিয়ে,

প্রতিটি অন্তরেই রয়েছে মুক্ত একটি আঙ্গিনা,

যা এমনই রাজ্য যেখানে করা যায় ঘনিষ্ঠভাবে আলোচনা,

কাঙ্ক্ষিত নয় যার প্রকাশ ও প্রচারণা’।

চৌদ্দতম আদবের শর্ত এই যে, তুমি তোমার গোপন বিষয়গুলো তোমার পীরের কাছে প্রকাশ করবে। তা গোপন রাখার কোনো অনুমতি নেই। খোদা তা’লার তরফ থেকে তোমার প্রতি যে পুরস্কার বর্ষিত হয়েছে তার সবই পরিষ্কার ভাষায় ও সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা সহকারে পীরের কাছে ব্যক্ত করবে, যাতে করে তিনি এগুলো সম্পর্কে বিচার-বিবেচনা করতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ, তোমার সজ্ঞানে কোনো ব্যক্তিগত গোপন বিষয় তাঁর কাছে গোপন রাখা হলো; এটি হয়তো পরবর্তী পর্যায়ে অন্তরে জট সৃষ্টি করতে পারে যার দরুণ হয়তো তোমার শায়খের কাছ থেকে উপদেশ ও সাহায্যপ্রাপ্তিতে বিঘ্ন সৃষ্টি হতে পারে। তুমি এটা শায়খের খেদমতে পেশ করলে জট অপসারিত হবে।

পনেরোতম আদব দাবি করে যে তোমার পীর (কিংবা তাঁর কাছ থেকে তোমার কাছে আগত কিছু) সম্পর্কে অন্য কাউকে কিছু বলতে হলে তার উপলব্ধি ক্ষমতার সাথে বিষয়টি সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে। এমন কোনো অস্পষ্ট কিংবা সূক্ষ্ম বিষয় তাকে বলো না যা সে বুঝতে অক্ষম। এটা তার জন্যে অর্থহীন, এমন কি ক্ষতিকরও হতে পারে। ওই ব্যক্তি হয়তো তোমার পীরের প্রতি বদ ধারণাও পোষণ করতে পারে।

মুরীদ এসব আদব পালন করলে খোদায়ী করুণার নূর (জ্যোতি/আলো) এবং তাঁর অফুরন্ত নেয়ামত (আশীর্বাদ) তোমার প্রতি অবতীর্ণ হবে; যার প্রতি তোমার লক্ষ্য ছিল তা তোমার যাহেরী (প্রকাশ্য) ও বাতেনী (অপ্রকাশ্য) সত্তায় প্রকাশ পাবে এবং তুমি খাস্ (বিশেষ) দলে নিজ স্থান করে নেবে। লক্ষ্য করো যে, ওপরে উদ্ধৃত ১৫টি আদব কেবলমাত্র যথাযথ আচরণ উপলব্ধি করার জন্যেই, যাতে করে শিক্ষা দান ও তা গ্রহণ সংঘটিত হতে পারে। স্থান-কাল-পাত্রভেদে প্রতিটি সূফী তরীকা ও পীর মাশায়েখবৃন্দ এ সব আদবের সংস্কার সাধন করতে পারেন।

[মাহমুদ কাশানীর রচিত ‘মিসবাহ্ আল হেদায়া ওয়া মিফতাহ্ আল কেফায়া’ - “সঠিক পথের চেরাগ ও পর্যাপ্ত জ্ঞানের চাবিকাঠি” শীর্ষক পুস্তকের ১৫টি আদব অনুবাদ এখানে সমাপ্ত হলো)।

[এটি www.zahuri.org/article8.html শীর্ষক ওয়েবসাইট থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে]